প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
1695
১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
ঐতিহাসিক ‘রাশিয়া দিবস’ (Russia Day) উদ্যাপন উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় এক বর্ণাঢ্য ও চিত্তাকর্ষক সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করেছে ঢাকাস্থ রুশ সংস্কৃতি কেন্দ্র (রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকা)। গতকাল শনিবার (১৩ জুন) কেন্দ্রটির মিলনায়তনে এই উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা দুই দেশের মানুষের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক মৈত্রী ও দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন ঢাকাস্থ রাশিয়ান হাউসের পরিচালক আলেকজান্দ্রা খলেভনই। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি রাশিয়া দিবসের গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য, রাশিয়ান ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্বাধীন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব সুদৃঢ়করণে এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অপরিহার্য ভূমিকার কথা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন।
এরপর মঞ্চে বিশেষ বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ান ফেডারেশন দূতাবাসের মিনিস্টার-কাউন্সেলর ভিয়াচেস্লাভ সেন্টিউরিন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। একই সাথে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে শিক্ষা, মানবিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পর্বের শুরুতেই আধুনিক রাশিয়াকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে একটি তথ্যবহুল মাল্টিমিডিয়া ডকুমেন্টারি বা উপস্থাপনা প্রদর্শন করা হয়। এতে রাশিয়ার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি এবং দেশটির সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দর্শকদের সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়।
সাংস্কৃতিক উৎসবের প্রধান ও বিশেষ আকর্ষণ ছিল রাশিয়ার স্বায়ত্তশাসিত তাতারস্তান প্রজাতন্ত্র থেকে সরাসরি আগত ‘ইয়েলাবুগা কলেজ অব কালচার অ্যান্ড আর্টস’-এর বিখ্যাত লোকসংগীত ও নৃত্যদল ‘আলাবুগা’-এর প্রাণবন্ত পরিবেশনা। ঐতিহ্যবাহী রুশ ও তাতার লোকসংগীত, দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা এবং চোখধাঁধানো নৃত্যের নিখুঁত যুগলবন্দির মাধ্যমে তারা রাশিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শত বছরের পুরোনো সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে তোলেন।
কনসার্টে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী রাজিল গাব্বাসভ রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী লোকবাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে শোনান এবং তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের সম্মানিত রাষ্ট্রীয় শিল্পী দিলইয়ারা মিরোভায়েভা তাঁর জাদুকরী কণ্ঠে বিশেষ সংগীত পরিবেশন করে হলভর্তি দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
যৌথ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বাংলাদেশের শিশু নৃত্যদল ‘হ্যাপিনেস’। বিশেষ বিষয় হলো, এই শিশু নৃত্যদলের প্রতিটি সদস্যই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা বাংলাদেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সন্তান। তাদের পরিবেশিত ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল বাংলা লোকনৃত্য রাশিয়া ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যকার গভীর আত্মিক বন্ধুত্বের এক চমৎকার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে দর্শকদের করতালিতে সমাদৃত হয়।
এছাড়াও বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে স্থায়ীভাবে বসবাসরত রাশিয়ান স্বদেশি সম্প্রদায়ের (Russian Diaspora) প্রতিনিধিরাও এই আনন্দ উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হন। তারা ‘গ্লিয়াঝু ভ ওজিওরা সিনিয়ে’ শিরোনামের কালজয়ী রুশ গান ও কবিতা আবৃত্তি করেন এবং বিশ্বখ্যাত অত্যন্ত জনপ্রিয় রুশ লোকসংগীত ‘করোবেইনিকি’-এর ছন্দময় তালের সাথে চমৎকার নৃত্য পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ অংশ সম্পূর্ণভাবে তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রকে উৎসর্গ করা হয়, যেখানে এর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক রাজধানী ‘কাজান’ শহরের সাথে ঢাকাবাসীকে পরিচিত করা হয়।
মনোজ্ঞ কনসার্ট শেষে আমন্ত্রিত অতিথিরা রাশিয়া দিবস উপলক্ষ্যে রুশ কেন্দ্র প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিশেষ সাংস্কৃতিক মেলা ঘুরে দেখেন এবং সেখানে দুটি চমৎকার প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে ‘মাল্টিকালচারাল রাশিয়া’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে রাশিয়ার বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী ও তাদের যাপনচিত্র এবং ‘প্রিস্টিন রাশিয়া’ প্রদর্শনীতে দেশটির বরফাবৃত অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়।
মেলার মূল প্রাঙ্গণে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুল ‘মাতরিয়োশকা’ (Matryoshka) লাইভ রং করার বিশেষ কর্মশালা, রুশ ধাঁচের দৃষ্টিনন্দন ফটোজোন, ঐতিহ্যবাহী স্মারক সামগ্রীর (Souvenirs) প্রদর্শনী এবং রাশিয়ার বিখ্যাত মুখরোচক খাবার ও ঐতিহ্যবাহী পানীয়র স্টল সাজানো হয়, যা দর্শনার্থীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
ঢাকায় আয়োজিত এই জমকালো উদ্যাপনটি বাংলাদেশে রুশ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি স্থানীয় তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এটি দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যকার সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।