প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম
1696
১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
চীনে চার দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক সফর শেষে আজ শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে রাজধানী ঢাকায় ফিরেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় প্রতিনিধিদল। আজ দুপুর ২টায় প্রতিনিধিদলটিকে বহনকারী বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
এর আগে, চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে কুনমিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ‘চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স’-এর একটি নিয়মিত ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয় সংসদীয় দলটি। বিদায়কালে চীনের ইউনান প্রদেশের ভাইস গভর্নর ইয়ুআন ওয়াং কুনমিং বিমানবন্দরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে বিশেষ ভিআইপি (VVIP) প্রটোকলে রাষ্ট্রীয় বিদায় জানান।
চীনের ইউনান প্রদেশের গভর্নরের বিশেষ আমন্ত্রণে গত ১১ জুন কুনমিংয়ে আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ‘৭ম চায়না-সাউথ এশিয়া কো-অপারেশন ফোরাম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে মূল বক্তব্য রাখেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এই আন্তর্জাতিক ফোরামে আরও বক্তব্য রাখেন ইউনান প্রভিন্সের গভর্নর ওয়াং ইউরো, নেপাল ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ভাইস চেয়ারম্যান লায়লা কুমারী বান্দরী, মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ইরাথিশাম আদাম, শ্রীলংকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অরুন হিমাচন্দ্র, সার্কের (SAARC) মহাসচিব মো. গোলাম সরওয়ার, চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত খলিলুর রহমান, আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসাদুল্লাহ বিলাল কারিমি, ভূটানের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী কর্মা দর্জিসহ চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
পাশাপাশি, ডেপুটি স্পিকার কুনমিংয়ে চলমান ‘১০ম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোজিশন’-এ অংশ নেন। এই এক্সপোজিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, এবারের এক্সপোজিশনে ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। মেলায় বাংলাদেশি পণ্যের সমাহারে সাজানো ৮৪টি আকর্ষণীয় প্যাভিলিয়ন স্থান পেয়েছে। আগামী ১৬ জুন পর্যন্ত চলমান এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিশ্বের ৬৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে।
সফরকালে ডেপুটি স্পিকার চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ভাইস চেয়ারম্যান হি ওয়াই, চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির ইউনান প্রদেশের সেক্রেটারি ওয়াং নিং এবং ইউনান প্রদেশের গভর্নর ওয়াং ইয়োবোর সাথে পৃথকভাবে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠকে মিলিত হন।
উক্ত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ **‘কুনমিং-চট্টগ্রাম সরাসরি সংযোগ সড়ক’** নির্মাণের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সাথে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা খ্যাত **‘তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প’** নির্মাণে চীনা কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, হাই-টেক শিল্প, বিশেষ ইকোনমিক জোন এবং পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ বাড়ানোর অনুরোধ করেন তিনি।
বৈঠকে ডেপুটি স্পিকার চীনের শীর্ষ নেতাদের জানান, চলতি জুনের শেষের দিকে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারও চীনের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করবে।
প্রতিক্রিয়ায় চীনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ও পিপলস কংগ্রেসের নেতারা বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সাথে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা স্পষ্ট জানান, বেইজিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ‘সর্বাধিক গুরুত্ব’ দিচ্ছে। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে এক নতুন যুগের সূচনা হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আজ সকালে কুনমিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার পথে ডেপুটি স্পিকার চীনের ইউনান প্রদেশে চলমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ‘চালকবিহীন ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যবস্থা’র (Autonomous/Driverless Future Transport) একটি যুগান্তকারী পাইলট প্রকল্প সরজমিনে পরিদর্শন করেন।
চীনের এই ভবিষ্যৎ পরিবহন মডেলটি কেবল নতুন সড়ক বা রেলপথ নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি স্মার্ট, সবুজ (Green), নিরাপদ এবং এআই-সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা। ইউনান প্রদেশের ‘ডিজিটাল ইউনান’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিবহন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বিগ ডেটা (Big Data) এবং ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আওতায় রিয়েল-টাইম ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্তকরণ এবং ই-টোল ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্মার্ট সিটি নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
উল্লেখ্য, ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বাধীন এই সংসদীয় প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন—জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আকতার হোসেন, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব এবং সংরক্ষিত নারী আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য জেসমিন সুলতানা জুঁই।