প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৬, ১০:৪৯ এএম
1704
১৪ জুন ২০২৬, ০৫:২৪ এএম
অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়মের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। মূলধন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণের চাপে একের পর এক ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে পুরো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।
এর আগে একই বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। যদিও সর্বশেষ প্রান্তিকে ঘাটতির পরিমাণ সামান্য কমেছে, তবে অর্থনীতিবিদদের মতে এটি প্রকৃত উন্নতির প্রতিফলন নয়। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পুনঃতফসিল নীতির কারণে কাগজে-কলমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক দেখানো হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট বলতে বোঝায়, একটি ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যাওয়া। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) গত ডিসেম্বর শেষে নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ সংকটের মূল কারণ লাগামহীন খেলাপি ঋণ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এত বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং মূলধন ঘাটতি আরও বাড়ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকের, যার পরিমাণ ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।
ইসলামী ধারার সাতটি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, যা ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ১২ কোটি টাকা।
বেসরকারি খাতের সাতটি ব্যাংকেও বড় ধরনের মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে। এসব ব্যাংকের মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এছাড়া এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং সিটিজেনস ব্যাংকের ঘাটতি ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আগ্রাসী ঋণ বিতরণ এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই ব্যাংক খাতে এ সংকট তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ঋণ কেলেঙ্কারি ও আর্থিক অনিয়মের কারণে অনেক ব্যাংক ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুনঃতফসিল নীতির আওতায় কিছু খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি রাখার চাপ কমেছে। যেহেতু এই সঞ্চিতি মূলধন থেকেই সংরক্ষণ করতে হয়, তাই সাময়িকভাবে মূলধন ঘাটতিও কিছুটা কমে এসেছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, পুনঃতফসিল বা বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি দেখানো গেলেও ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
ব্যাংকাররা আরও সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমাগত মূলধন সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও দেশের ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।