প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
1697
১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু র বাজেট পেশ
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন, উৎপাদনশীল খাতকে শক্তিশালী করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।
নিত্যপণ্যে কর কমিয়ে স্বস্তির উদ্যোগ
নতুন বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এসেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি ও বিভিন্ন কৃষি বীজসহ প্রায় ৬০টি প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ ও লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলাজাত পণ্যের ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতেও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিডনি রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব খাতে বিশেষ সুবিধা
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটর এবং প্রিন্টার আমদানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এতে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে নতুন গতি আসবে।
একইসঙ্গে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর কর কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সুরক্ষা ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
যদিও অনেক খাতে কর কমানো হয়েছে, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে। সিগারেটের সব স্তরে ন্যূনতম মূল্য বৃদ্ধি এবং নিকোটিনজাত কিছু পণ্যের ওপর উচ্চ হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপের ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
এছাড়া ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনচালিত মধ্যম সারির গাড়ির ওপর কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদেশি কাজুবাদাম, মধু, সুপারি, কিছু আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য, কম্পোজিট গ্যাস সিলিন্ডারসহ কয়েকটি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের বাজারমূল্য বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি
ঘোষিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বড় অংশ ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, পূর্ববর্তী সময়ের ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অর্থায়নের এ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সংস্কারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
ব্যবসায়ী মহলের একাংশ বাজেটকে বিনিয়োগ ও শিল্পবান্ধব হিসেবে দেখছেন। শিল্প খাতের কাঁচামালে উৎসে কর কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রণোদনা, বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর সুবিধা এবং অনলাইন ভ্যাট ব্যবস্থার সম্প্রসারণকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তবে করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে কিছু ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়সীমা বৃদ্ধি করা হলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরও বেশি উপকৃত হতো।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তাদের মতে, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা, রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা ভবিষ্যতে চাপ তৈরি করতে পারে। এছাড়া বাজেটের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।
বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি বোঝা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, দক্ষ জনবলের অভাব, বৈদেশিক অর্থায়নের অনিশ্চয়তা এবং নীতিনির্ধারণী সমন্বয়ের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার প্রত্যাশার তুলনায় কম রয়েছে। ফলে নতুন অর্থবছরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের অভিমত, বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একদিকে যেমন জনস্বস্তির প্রতিশ্রুতি বহন করছে, অন্যদিকে এটি সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।