শনিবার ০৬, জুন ২০২৬

০৬ জুন ২০২৬, ০২:৪৯ এএম

থেমে গেল রাজপথ কাঁপানো সেই কণ্ঠস্বর, বিদায় ‘আওয়ামী লীগের তোফায়েল’

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২৬, ১১:১৩ এএম

1712

প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। থেমে গেল রাজপথ কাঁপানো এক দৃপ্ত কণ্ঠস্বর। বিদায় নিলেন দেশের স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার অন্যতম সাক্ষী এবং প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ।

সোমবার (১ জুন) রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবেই নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যক্ষ অংশীদার হিসেবে তোফায়েল আহমেদের নাম স্মরণ করা হবে দীর্ঘদিন।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন এবং ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

শপথ দিবসের সেই ঐতিহাসিক স্লোগান

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু স্মরণীয় ঘটনা। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি।

ঐতিহাসিক শপথ দিবসের জনসভায় তার উচ্চারিত স্লোগান আন্দোলনরত জনতার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। সে সময় ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মাঝে যে আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তার অন্যতম মুখ ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনের মাধ্যমে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর মুক্তি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে বাস্তবতায় রূপ নেয়।

ছাত্ররাজনীতির কিংবদন্তি নেতা

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ভিপি এবং পরে ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ছাত্রসমাজের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তার নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং রাজনৈতিক দাবি আদায়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পরিচালনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় তার বক্তৃতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়। রাজপথে তার উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করত।

‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি হলো শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঐতিহাসিক ঘোষণা।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করেন।

সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী স্থান করে নেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এ ঘটনা আজও বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।

স্বাধীনতার পর জাতীয় রাজনীতির অন্যতম দিকপাল

স্বাধীনতার পর জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে বক্তব্য রেখেছেন।

তার রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। ভোলার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। সংসদে তিনি বরাবরই উপকূলীয় অঞ্চল, উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের নানা সমস্যা তুলে ধরতেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শিল্প, বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।

রাজনৈতিক জীবনের চড়াই-উতরাই

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন শুধু সাফল্যের গল্প নয়, বরং সংগ্রাম ও প্রতিকূলতারও ইতিহাস।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘ সময় তিনি রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার, মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাননি।

পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটকালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলের ভেতরে ও বাইরে নানা মতভেদ ও পরিবর্তনের মধ্যেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনের অজানা অধ্যায়

রাজনীতির পাশাপাশি পারিবারিক জীবনেও দায়িত্বশীল ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তার দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন ছিল। তাদের একমাত্র কন্যা চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত।

পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধের নানা দৃষ্টান্ত ঘনিষ্ঠজনদের মুখে শোনা যায়। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের প্রতি তার স্নেহ ও দায়িত্বশীল আচরণ তাকে একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও পরিচিতি দিয়েছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে অপূরণীয় শূন্যতা

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা।

স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে তার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

রাজপথের সেই সাহসী কণ্ঠস্বর, জনসভা মাতানো বক্তা এবং সংসদের অভিজ্ঞ রাজনীতিক আজ আর নেই। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার অবদান, নেতৃত্ব এবং সংগ্রামের স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলোচিত হবে।

একটি দেশের ইতিহাস কিছু মানুষের হাত ধরে নির্মিত হয়। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ, যিনি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নন, বরং ইতিহাস নির্মাণেরও অংশীদার ছিলেন। তাই তার প্রস্থান শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।

Link copied!