প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
1700
১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ এএম
শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ
ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক দূরদর্শী আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত দেশীয় খুনিদের দ্রুত চিহ্নিত করা, বিদেশে (ভারতে) পালিয়ে যাওয়া মূল খুনিদের অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে রাজধানী ঢাকায় বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। ছাত্র-জনতার এই সমাবেশ থেকে আলটিমেটাম দিয়ে বক্তারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, "এই নির্মম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই করতে হবে। ওসমান হাদি হত্যার বিচার আদায় না করে আমরা আর ঘরে ফিরে যাব না।"
আজ শুক্রবার (১২ জুন) বাদ জুমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসি সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম শীর্ষ সদস্য জি এ সাব্বির তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "গত সপ্তাহের বিক্ষোভ মিছিল শেষে আমরা খুনিদের ফিরিয়ে আনার অগ্রগতির বিষয়ে প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট এক সপ্তাহের (৭ দিন) সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। আমরা তখন অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের উদ্দেশে বলেছিলাম—কোনো ধরনের রাজনৈতিক ছলচাতুরী নয়, ঠিক কতদিনের মধ্যে ওসমান হাদির খুনিকে ভারত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে এনে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচার করবেন, তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জাতিকে বলে দিন। রাষ্ট্রের উচিত ছিল স্বউদ্যোগে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা স্পষ্ট করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্র এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইস্যুটিকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না।"
জি এ সাব্বির আরও বলেন, "প্রশাসন নীরব থাকায় আমরা নিজেরাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং জানতে চেয়েছি ঠিক কত সময় হলে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার তারা সম্পন্ন করতে পারবে। তারা আমাদের কাছে কিছুটা সময় চেয়েছে। আমরা তাদের অল্প কিছুদিনের জন্য শেষ সুযোগ হিসেবে সময় দেব। এই সময়ের মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তদন্ত সংস্থাসহ রাষ্ট্রের যত গুরুত্বপূর্ণ উইং আছে—সবার দ্বারস্থ হবে এবং জানতে চাইবে ওসমান হাদি হত্যার বিচার কবে হবে? তারা যদি নির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হয়, তবে ইনকিলাব মঞ্চ এই হত্যা মামলার যাবতীয় নথিপত্র ও আলামতসহ দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে শাহবাগ মোড়ে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘটে বসে যাবে। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না।"
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার বর্তমান প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, "বিগত অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান নির্বাচিত সরকারও দুঃখজনকভাবে ওসমান হাদি হত্যার স্পর্শকাতর রহস্যকে একটি সস্তা ‘পলিটিক্যাল টুল’ বা রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। যখনই দেশে তেলের দাম বাড়ে, হাম রোগে শিশু মারা যায়, ফেরিঘাটে বাস ডুবে প্রাণহানি ঘটে কিংবা দেশে কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়; তখনই জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ঘুরাতে সরকারের পক্ষ থেকে হঠাৎ বলা হয় যে—তারা হাদির মূল খুনিকে ভারত থেকে দেশে ফেরত আনছে। সরকারকে স্পষ্ট বলতে চাই, এসব রাজনৈতিক খেলা বন্ধ করুন এবং অবিলম্বে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার সম্পন্ন করুন।"
**ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড ও মামলার বর্তমান প্রেক্ষাপট:**
উল্লেখ্য, শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন ছাত্র-জনতার অধিকার আদায়ের জনপ্রিয় সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক। তিনি দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক পরদিন, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার পল্টন মডেল থানার বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাঁকে লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি ছোঁড়ে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি এই বহুল আলোচিত হত্যা মামলার তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তড়িঘড়ি করে ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি প্রাথমিক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। কিন্তু ১৫ জানুয়ারি মামলার মূল বাদী এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ডিবির ওই অভিযোগপত্রটিকে অসম্পূর্ণ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে আদালতে ‘নারাজি’ আবেদন দাখিল করেন। বাদীর নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত মামলাটি অধিকতর ও নিখুঁত তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। তবে দুঃখের বিষয়, আদালত সিআইডি-কে দায়িত্ব দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সংস্থাটি এখনো মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বিতর্কিত বক্তব্যের পর ওসমান হাদির বোনও এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।