প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
1699
১৩ জুন ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম
ঢাকার লেকশোর হোটেলে আয়োজিত 'জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন থাকলেও এর অর্থনৈতিক প্রাক্কলন বা ভিত্তিগুলো মোটেও বাস্তবসম্মত হয়নি বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে যে গাণিতিক ভিত্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সঠিক হয়নি। ফলে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাহীনতা তৈরি হতে পারে।’
আজ শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য গবেষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন—এই তিনটি মূল শক্তির ওপর ভিত্তি করে নতুন সরকার কাজ করতে চাচ্ছে। বাজেটে রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে শুল্ক হারের যে সমন্বয় করা হয়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই।’
তবে, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘প্রথম যে বড় ঝুঁকিটি আমি দেখি, তা হলো চলতি অর্থবছরের যে ভিত্তি ধরে প্রবৃদ্ধি, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণ বা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, সেই ভিত্তিটিই অত্যন্ত দুর্বল।’
সুনির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বলেন, গত ১০ মাসে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যেখানে ১.৮ শতাংশ ঋণাত্মক (নেতিবাচক), সেখানে নতুন বাজেটে ৮.৭ শতাংশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। একইভাবে বাস্তব মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে থাকলেও বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বছর শেষে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বাজেটের প্রাক্কলনগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন মনে হচ্ছে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (চতুর্থ কোয়ার্টারে) হঠাৎ করে দেশের অর্থনীতিতে একটি ‘চাঞ্চল্যকর ও অলৌকিক পরিস্থিতি’ তৈরি হবে; যেখানে প্রবৃদ্ধি হঠাৎ লাফিয়ে বাড়বে, মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ও সম্পদ আহরণ আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এই ধরনের গাণিতিক প্রাক্কলন কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয় এবং এটি বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা পেয়েছে। তাই গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর মার্চ থেকে জুনের এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্ট ও সততার সাথে স্বীকার করে যদি ভিত্তিটি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হতো, তবে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাগুলো অনেক বেশি টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য হতো।’
বিনিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিনিয়োগ চাঙ্গা করার জন্য আমদানির বিকল্প শিল্প ও রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বাজেটে বিভিন্ন রাজস্ব প্রণোদনা ও ভালো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, সঠিকভাবে চিন্তা করতে হবে যে আমরা বিনিয়োগের জন্য ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ বা এক দরজার সেবা চালু করলেও, শিল্পে যদি গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিনিয়োগ আসবে না। সুতরাং এই অবকাঠামোগত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বাজেটের এই সামগ্রিক প্রচেষ্টাটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘ডিপার্চার’ (নতুন ও ইতিবাচক যাত্রা) হিসেবে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। তবে, এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মতো অবকাঠামোগত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এগুলো রাতারাতি নিশ্চিত করার জন্য মাত্র এক বছর বা ১২ মাস কোনো যথেষ্ট সময় নয়।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর বিভাগকে এখন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে, ১৮ শতাংশ নয়। কারণ, এবার আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড়, তা আমরা সবাই জানি। লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হলে যেসব খাতে ঢালাও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেক জায়গাতে সংশোধন আনা প্রয়োজন। রপ্তানিমুখী শিল্পে দেওয়া প্রণোদনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই সুযোগ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ আসতে সময় লাগবে। বেসরকারি খাত এই সুযোগগুলো ব্যবহার করে বিনিয়োগ ও আয় বাড়াবে এবং সেখান থেকে বেশি রাজস্ব আসবে—এই সমীকরণটি ফলপ্রসূ হতে আরও সময়ের প্রয়োজন।’
বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই বাজেটে এক বছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং এটি সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এতদিন আমাদের অর্থনীতিতে একটি ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ বা নিম্ন পর্যায়ের ভারসাম্য ছিল; আমরা রাজস্ব আহরণ কম করেছি এবং সরকারের ব্যয়ও কম করেছি, যার ফলে ঘাটতি একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে ছিল। কিন্তু এখন নতুন সরকার যদি জনকল্যাণে ব্যয় ঠিকমতো করতে চায় এবং বিপরীতে আয় কম হয়, তবে ব্যাংক ব্যবস্থা বা বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ মারাত্মকভাবে বাড়াতে হবে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটাতে গেলে অর্থনীতিতে বিধ্বংসী মূল্যস্ফীতি ও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, নিট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড় ধরা হয়েছে। গত বছরও আমরা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো নিট বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধ (ডেট সার্ভিসিং) করেছি। নতুন বাজেটে এত বড় প্রাক্কলনের ফলে এবং সুদ পরিশোধের পরিমাণ এখনই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হওয়ায়, এটি সামনে আরও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
কাঠামোগত দিক থেকে বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং শুল্ক ও রাজস্ব নীতিমালা ভালো হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপরই এর আসল ফলাফল নির্ভর করবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। স্বাস্থ্য খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “সেখানে প্রকৃত ব্যয় ও বরাদ্দের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কাঠামোগত সংস্কারের দিকে সরকারের আরও বেশি নজর দেওয়া দরকার ছিল, যাতে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং ‘গুড ভ্যালু ফর মানি’ অর্থাৎ জনগণের টাকার সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।”