শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

স্মার্টফোন আসক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের ঝুঁকি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬, ১০:২৯ এএম

1705

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফাইল ছবি

একসময় কিশোর-কিশোরীদের অবসর সময় কাটত পাড়া-মহল্লার মাঠ, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা স্কুলভিত্তিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে সেই বাস্তবতায় এসেছে বড় পরিবর্তন। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমিং, ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম এবং মেসেজিং অ্যাপ তরুণ প্রজন্মের যোগাযোগ ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

তবে প্রযুক্তির এই বিস্তৃত ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, অনলাইন আসক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সমাজবিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্মার্টফোন কিশোর গ্যাং সদস্যদের যোগাযোগ, দল গঠন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, তাদের একটি বড় অংশ ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা, অনুসারী বাড়ানোর প্রতিযোগিতা এবং অনলাইন পরিচিতি তৈরির আকাঙ্ক্ষা অনেক কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহিত করছে। কোথাও কোথাও প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা নতুন সদস্য আকৃষ্ট করতেও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমানে অল্প বয়সেই শিশু-কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তদারকি ও সচেতনতার অভাব থাকায় অনেকেই অনলাইন জগতের নেতিবাচক প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে কিশোরদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকার ফলে তারা বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যেতে পারে, যা তাদের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বব্যাপী শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশ। স্পেন, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে এবং চীনেও বয়সভিত্তিক বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সীমাবদ্ধতা চালু রয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়ে বিভিন্ন দেশে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ব্যাহত করে এবং পাঠে পুনরায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে উল্লেখযোগ্য সময় প্রয়োজন হয়। এ কারণে বিশ্বের বহু দেশে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা বা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে দায়িত্বশীল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা বেশি কার্যকর। বর্তমান বিশ্বে অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন, তথ্যপ্রাপ্তি এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, অনেক শিশু ও কিশোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষামূলক কার্যক্রম, বই পড়া, গবেষণা কিংবা দক্ষতা উন্নয়নের মতো ইতিবাচক কাজে যুক্ত হচ্ছে। তাই প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক মোকাবিলার পাশাপাশি এর ইতিবাচক ব্যবহারও উৎসাহিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু-কিশোরদের সুস্থ সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি ডিভাইস ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ, অনলাইন কার্যক্রমে অভিভাবকীয় নজরদারি বৃদ্ধি এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক ও ক্রীড়ামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তাদের মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এটি যেমন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিশোরদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও মানসিক ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর নীতিমালার সমন্বয়ই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Link copied!