প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
1705
১৩ জুন ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় করছাড়ের বড় ধরনের বাড়তি সুবিধা দিতে যাচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে শুধু কর অব্যাহতি বা আয়কর ছাড়ই নয়, বরং ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) ও পণ্য আমদানির শুল্ক-করেও বড় ধরনের ঐতিহাসিক ছাড় দেওয়া হতে পারে।
মূলত দেশীয় শিল্পের টেকসই সুরক্ষা, স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণ, নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতেই এই মেগা করছাড় দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ইলেকট্রনিক্স খাতকে সরকার সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এই করছাড় বা কর অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে।
---
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
১. দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য:
দেশীয় শিল্পের সম্প্রসারণে দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ ও হাউজহোল্ড পণ্যের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি এসব পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ককর ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে, যার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে। এর ফলে দেশে তৈরি ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। বর্তমানে এই শিল্পে ২২টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
২. জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী:
ওষুধ তৈরির ৬৮ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে, যার ফলে ওষুধের দাম কিছুটা কমবে। এছাড়া, হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর থেকে ১০ শতাংশ ভ্যাট এবং ক্যানসারের নয় ধরনের ওষুধ আমদানিতে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার হলে ডায়ালাইসিস খরচ প্রতিবারে ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
৩. নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য:
নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য যেমন— ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ ৬০টি পণ্যের উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া, আমদানি করা শিশুখাদ্যের দাম কমাতেও শুল্ক-করে ছাড় আসতে পারে।
৪. সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি:
পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় ২০৩০ সাল পর্যন্ত এবং সৌর বিদ্যুতের সব ধরনের উপকরণ আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এছাড়া, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করমুক্ত রাখা এবং সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ রেয়াত দেওয়া হতে পারে।
৫. ইলেকট্রিক গাড়ি, ই-বাইক ও হাইব্রিড গাড়ি:
স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। ইলেকট্রিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে গাড়ির কিলোওয়াট অনুযায়ী ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, ১৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) প্রত্যাহার হতে পারে।
৬. কম্পিউটার, মোবাইল সামগ্রী ও স্বর্ণালঙ্কার:
দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইলের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। অন্যদিকে স্বর্ণ বিক্রিতে বর্তমানে প্রযোজ্য ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে নির্দিষ্ট হারে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হতে পারে, যার ফলে স্বর্ণালঙ্কারের দাম কমতে পারে।
৭. কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুখবর:
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় সুখবর আসছে এবারের বাজেটে। তাদের ওপর থাকা বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও ৭ শতাংশ আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার বা বাতিল করা হতে পারে।
৮. অন্যান্য যেসব সেবার দাম কমবে:
মোবাইল সিম: মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা কর বাতিল হতে পারে।
শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পণ্য: ১৫টি আমদানি করা পণ্যের অগ্রিম কর ৫% থেকে কমিয়ে ১-২% করা হতে পারে।
বাদ্যযন্ত্র ও এটিএম কার্ড: বাদ্যযন্ত্র আমদানির ৫% শুল্ককর এবং এটিএম কার্ড তৈরির কাঁচামাল আমদানির ৫% আগাম কর প্রত্যাহার হতে পারে।
মৃতদেহ সংরক্ষণ: মর্চুয়ারি আমদানিতে শুল্ক ২৫% থেকে কমিয়ে ১% করা হচ্ছে।
দেশি পণ্য সুরক্ষায় যেসব বিদেশি ও বিলাসী পণ্যের দাম বাড়তে পারে
১. কাজু বাদাম ও হিমায়িত মাছ:
দেশে বাণিজ্যিকভাবে কাজু বাদাম চাষ শুরু হওয়ায় দেশীয় ফলের সুরক্ষায় কাজু বাদাম আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া, পাঙাস মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং উচ্চ মূল্যের দামি হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হতে পারে।
২. তামাক ও সিগারেট:
তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার কমাতে সিগারেটের দাম প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা বাড়তে পারে। সিগারেটের ফিল্টার তৈরির পেপার আমদানিতে ৩০০ শতাংশ ও নিকোটিনে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং নিকোটিন পাউচে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানোর কারণে ধূমপায়ীদের খরচ বাড়বে।
৩. দেশি ও বিদেশি মদ:
দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মদে প্রতি লিটারে ৪০০ থেকে ৪base০ টাকা সুনির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) ভ্যাট বসানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এছাড়া, আমদানি করা বিদেশি মদের দামও বাড়তে পারে, যেগুলোতে বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে ৪৫০ থেকে ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর রয়েছে।
৪. এমএস রড ও নির্মাণ সামগ্রী:
দেশে মাইল্ড স্টিল (এমএস) এবং এ জাতীয় পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর (স্পেসিফিক ট্যাক্স) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে, যার ফলে রডের দাম বাড়তে পারে।
৫. বিদেশি বিলাসী সামগ্রী:
বিদেশি প্রসাধনী, বিলাসী পণ্য, আমদানি করা উচ্চমূল্যের খাদ্যপণ্য এবং নতুন ১০টি পণ্যের আমদানি পর্যায়ে ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কারণে এগুলোর দাম বাড়তে পারে।