প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৬, ১২:২০ এএম
1699
০৬ জুন ২০২৬, ০২:৪৯ এএম
ক্যান্সার চিকিৎসায় ইনজেকশন
ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে ত্রিমুখী কার্যক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক ইনজেকশন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একাধিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়া রোগীদের ওপর প্রয়োগ করে গবেষকেরা উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, এই ফলাফল ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আশাব্যঞ্জক।
বিশ্বের ১১টি দেশে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় এমন রোগীদের এই ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাদের ক্যান্সার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা চিকিৎসার পর পুনরায় ফিরে এসেছিল। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় নতুন এই ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়।
গবেষণায় ব্যবহৃত অ্যামিভান্টাম্যাব নামের ইনজেকশনটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলেছে। ট্রায়ালের ফলাফল অনুযায়ী, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগীর টিউমারের আকার কমে এসেছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৫ জন রোগীর শরীরে থাকা টিউমার সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় বলে চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করেছেন।
গবেষণার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যান্সারবিষয়ক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর একবার এই ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয় এবং অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ছিল।
পরীক্ষামূলক প্রয়োগে মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগী অংশ নেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার আকারে ছোট হয়েছে অথবা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমারের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ওষুধ ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ওপর ইনজেকশনটির কার্যকারিতা যাচাই করতে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হচ্ছে। মলদ্বার, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের ওপরও এর পরীক্ষা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যামিভান্টাম্যাব তিনটি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। প্রথমত, এটি ইজিএফআর নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে বাধাগ্রস্ত করে, যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি জৈবিক পথকে বন্ধ করে দেয়, যেটি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ অনেক সময় চিকিৎসার প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে।
এই চিকিৎসার মাধ্যমে উপকার পাওয়া রোগীদের মধ্যে ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ অন্যতম। তাঁর জিহ্বার ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর প্রচলিত কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি প্রয়োগ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। পরে তিনি একটি বিশেষ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেন এবং অ্যামিভান্টাম্যাব চিকিৎসা গ্রহণ শুরু করেন।
কার্ল জানান, চিকিৎসা শুরুর আগে মুখের ফোলা ও তীব্র ব্যথার কারণে কথা বলা এবং খাবার খাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। তবে নতুন চিকিৎসা গ্রহণের পর ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। ফোলা ও ব্যথা কমে আসে এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, মাত্র কয়েক ধাপ চিকিৎসা গ্রহণের পরই তাঁর খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যে তিনি আবার স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে সক্ষম হন। কেমোথেরাপির সময় যে ধরনের জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুভব করেছিলেন, নতুন এই চিকিৎসায় সেগুলোর বেশিরভাগই আর দেখা যায়নি।
চিকিৎসকেরা মনে করছেন, ক্যান্সার চিকিৎসায় অ্যামিভান্টাম্যাব ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন, তবুও প্রাথমিক ফলাফল ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।