সোমবার ১৫, জুন ২০২৬

১৫ জুন ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

বেনজীরের মামলার নথিপত্র দুবাইয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি দুদকের

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

1693

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির সমস্ত নথিপত্র তৈরির চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। নথিপত্রগুলো চূড়ান্ত করার পর তা কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রেরণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠানো হবে।

আজ সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন যে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে প্রত্যর্পণ করার জন্য সমস্ত আইনি ও বিচারিক নথিপত্র তৈরির কাজ পুরোদমে চলছে। দুর্নীতির এইসব নথিপত্র চূড়ান্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হবে কূটনৈতিক চ্যানেলে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে যে দুর্নীতি মামলার অন্যতম প্রধান পলাতক আসামি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকাকে জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিস্থ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো। সেখান থেকে বাংলাদেশের এনসিবি তথা পুলিশ সদরদপ্তরের আন্তর্জাতিক পুলিশিং উইংকে একটি বিশেষ চিঠি দেওয়া হয়েছে।

উক্ত চিঠিতে এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নম্বর ৩৯/২০০৬ এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তারকৃত আসামির প্রত্যর্পণ বা ফেরত চেয়ে বাংলাদেশকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন পাঠাতে হবে। আমিরাতের আইন অনুযায়ী এই প্রত্যর্পণ আবেদনের সঙ্গে আরবি ভাষায় অনূদিত এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও সরকারি সিলযুক্ত সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য ও নথি সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক।

যার মধ্যে রয়েছে প্রত্যর্পণযোগ্য ব্যক্তির পূর্ণ নাম ও পরিচয়সহ ছবি এবং জাতীয়তা ও ঠিকানা। এছাড়া অভিযুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দেশীয় আইন এবং নির্ধারিত শাস্তি ও মামলার তামাদি সংক্রান্ত আইনি বিধানের অনুলিপি। সেই সাথে অনুরোধকারী দেশের বিচারিক আদালত কর্তৃক জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং মামলার বিস্তারিত বিবরণ যেখানে অপরাধের প্রকৃতি ও আসামির বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও অপরাধ সংঘটনের স্থান স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে। তদন্তাধীন মামলার ক্ষেত্রে বর্তমান তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি এবং দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আদালতের রায় বা দণ্ডাদেশের সত্যায়িত অনুলিপি সংযুক্ত করতে হবে। এনসিবি আবুধাবি এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে।

এর আগে গত ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল একটি ‘রেড নোটিশ’ জারি করেছিল। দুদকের করা দুটি মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে আদালতের নির্দেশনার পর ইন্টারপোলে এই রেড নোটিশ ইস্যু করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

মামলাগুলোর মধ্যে গত ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও স্থাবর অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপনের একটি বড় মামলা রয়েছে। ওই মামলায় ইতিমধ্যে আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এই মামলার বাদী দুদক উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিনের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সাবেক এই পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়।

দুদক সূত্রে জানা যায় যে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানকালে বেনজীরকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেওয়া হলে তিনি নিজের আইনজীবীর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট দুদকে একটি সম্পদ বিবরণী জমা দেন। সেখানে তিনি ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন। তবে দুদকের গভীর তদন্তে দেখা যায় যে বেনজীর আহমেদ তাঁর ঘোষণাকৃত সম্পদের মধ্যে ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ knotted০ টাকার সম্পদের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করেছেন এবং ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদের কোনো বৈধ উৎস দেখাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন যা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বলে দুদকের কাছে প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় চার্জশিটে অভিযোগ আনা হয়।

অন্যদিকে গত ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর নিজের আসল দাপ্তরিক পরিচয় গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ পাসপোর্ট নবায়ন করার অভিযোগে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে অপর একটি মামলা করা হয়। বেনজীর ছাড়া এই মামলার বাকি আসামিরা হলেন পাসপোর্টের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক এবং মুন্সী মুয়ীদ ইকরামসহ টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক ও বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।

ওই মামলার এজাহারে বলা হয় যে বেনজীর আহমেদ ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর পুলিশের ডিআইজি হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন নিজের হাতে লেখা সরকারি পাসপোর্ট সমর্পণ করে কোনো বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। আবেদন ফরমে ‘অফিসিয়াল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও প্রফেশনের ঘরে সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক অসদাচরণের আশ্রয় নিয়ে নিজেকে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ বা বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময়েও তিনি পাসপোর্টের আবেদনপত্রে জালিয়াতি করে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট আসামিরা বেনজীর আহমেদের উচ্চ দাপ্তরিক পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত থাকার পরেও কোনো বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ যাচাই না করে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে তাঁর নামে সাধারণ পাসপোর্ট ও ই পাসপোর্ট ইস্যুর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছিলেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও দি বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ এর ১১ ধারায় গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

বেনজীরের বিরুদ্ধে বর্তমানে ৭৪ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৪টি মূল মামলাসহ পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিং মিলিয়ে মোট ৬টি বড় মামলা রয়েছে। ঢাকা ও গাজীপুর করাসহ নারায়ণগঞ্জ এবং গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর ও বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ অঢেল অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দুবাইতে থাকা তাঁর দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাবও ইতিমধ্যে জব্দ করেছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি।

এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত রোববার (১৪ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের শুরুতে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক জরুরি বক্তব্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সংসদকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো ঢাকা কর্তৃক ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। গত ১১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে এটি পাঠানো হয়েছিল এবং আমরা বিষয়টি প্রতিনিয়ত মনিটর করেছি। ইন্টারপোল একটি ফাইল ও কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের প্রতি রেড নোটিশ জারি করে এবং সেই নোটিশের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অনুরোধ করা হয়। মন্ত্রী বলেন যে গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ থেকে পাঠানো একটি ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ সফলভাবে গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক রয়েছেন।

উল্লেখ্য যে গত ২০২০ সালে দেশের ৩০তম আইজিপি হিসেবে পুলিশ বাহিনীর প্রধান পদে দায়িত্ব নেন বেনজীর আহমেদ। সরকারি নিয়মানুযায়ী সরকারের সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর মর্যাদাপূর্ণ লাল বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেনজীর সেই লাল পাসপোর্ট নেননি। আইজিপি হয়েও তিনি ফের বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেন। সে সময় দেশে নতুন করে ই পাসপোর্ট চালু হলে তাঁর আবেদন নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। সেই আইনি জটিলতা সমাধান করতে তিনি নিজে আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে যাননি বরং অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে পাসপোর্ট অফিসের বিশেষ মোবাইল ইউনিট নিজের বাসায় চেয়ে পাঠান। পরে পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তারা আইজিপির বাসায় গিয়ে ছবি তোলা এবং আঙুলের ছাপ নেওয়াসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালের ৪ মার্চ তাঁর আবেদনপত্র জমা হওয়ার পর ওই বছরের ১ জুন বেনজীরের নামে ১০ বছর মেয়াদি সাধারণ ই পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল যা এখন সম্পূর্ণ অবৈধ ও জাল প্রমাণিত হয়েছে।

Link copied!