প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৬, ০১:৩৭ এএম
1701
০৬ জুন ২০২৬, ০২:৪৯ এএম
অভিযুক্ত থেকে মুক্ত নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস
ফরিদপুরে একটি ব্যাংকের ভল্ট থেকে প্রায় ৯৪ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় দায়ের করা মামলা ঘিরে দীর্ঘ ১৬ বছরের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাসকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট।
তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে চূড়ান্ত রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
একই ঘটনায় অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে দায়ের করা দেওয়ানি মামলায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা আপিলও খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হওয়ায় পরেশের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোট ৬০ হাজার টাকা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ফরিদপুরের একটি ব্যাংক শাখার ভল্ট থেকে ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯০ টাকা লুট হওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরদিন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থানায় মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় ব্যাংকের নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি ২০১৩ সালে অর্থ উদ্ধারের জন্য একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করা হয়। তবে ২০১৬ সালে সংশ্লিষ্ট আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয় এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে খরচও আরোপ করে। পরে সেই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হলেও সম্প্রতি হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেন।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, ভল্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট হওয়ার ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভল্ট কীভাবে খোলা হয়েছিল কিংবা কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল, সে বিষয়ে যথাযথ তদন্ত হয়নি বলেও আদালত পর্যবেক্ষণ দেন।
আদালতের মতে, তদন্তে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি। বিশেষ করে যাদের কাছে ভল্টের চাবি ছিল এবং ঘটনার দিন ব্যাংকে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হয়নি। ফলে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে আদালত মন্তব্য করেন।
হাইকোর্ট আরও বলেন, কেবল একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে দায়ী করে অন্যদের ভূমিকা উপেক্ষা করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের সামিল। ফলে আপিলটি খরচাসহ খারিজ করা হয় এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
চুরির অভিযোগে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় ২০২০ সালে বিচারিক আদালত পরেশ চন্দ্র দাসকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। পরে আপিলের পর সাজা কমিয়ে দুই বছর করা হয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করলে চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড ও দোষী সাব্যস্ত করার আদেশ বাতিল করে দেন। এর ফলে তিনি মামলার দায় থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি লাভ করেন।
তবে এই রায় ঘোষণার আগেই ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পরেশ চন্দ্র দাস মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মামলায় তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে পক্ষভুক্ত করা হয়।
পরেশের পরিবার জানায়, দীর্ঘ ১৬ বছরের আইনি লড়াই তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রকৃত অপরাধীরা এখনও বিচারের আওতার বাইরে থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরেশ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
পরেশের ছেলে জানান, ঘটনার সময় তাঁর বাবার চাকরিজীবনের প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর বাবার চাকরি-পরবর্তী সব প্রাপ্য সুবিধা পরিবারকে যথাযথভাবে প্রদান করা হবে।
এই মামলার রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি ঘটনার আইনি অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি ঘটলেও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের বিষয়টি এখনও প্রশ্নের মুখে রয়ে গেছে।