শনিবার ০৬, জুন ২০২৬

০৬ জুন ২০২৬, ০৩:৫৪ এএম

বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ আকর্ষণে সংশোধিত পিএসসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৬, ১২:০৪ এএম

1706

গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগরে এখনো বাণিজ্যিকভাবে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

 

অথচ দেশের সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির অন্যতম প্রধান সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত এই সমুদ্রসম্পদ দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষায় রয়েছে কার্যকর উদ্যোগের।

এই সম্ভাবনাময় খাতকে কাজে লাগাতে নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবার উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) আরও বিনিয়োগবান্ধব ও আকর্ষণীয় করা হয়েছে, যা বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এর আগে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে সমুদ্র এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সে সময় সাতটি বহুজাতিক কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করলেও কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পরও বছরের শেষ নাগাদ কোনো প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন পিএসসিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত চুক্তিতে গ্যাসের মূল্য কাঠামো উন্নত করা হয়েছে। পাশাপাশি পাইপলাইন ব্যবহারে ট্যারিফ সুবিধা এবং বিশেষ শর্তসাপেক্ষে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব সুবিধা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকল্পকে আরও লাভজনক ও আকর্ষণীয় করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশও বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তাদের ধারণা, সংশোধিত চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি অনুসন্ধানে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।

পিএসসি মূল্যায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দরপত্র আহ্বান করলেই হবে না, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ—উভয় পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

তবে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে তেল বা গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন একটি দীর্ঘমেয়াদি, জটিল এবং ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রায় ছয় মাস সময় দেওয়া হবে। এরপর প্রস্তাব মূল্যায়ন, আলোচনা এবং চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে প্রায় আরও এক বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রকৃত অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতেই সময় লাগতে পারে ছয় থেকে নয় বছর। এরপর আবিষ্কৃত গ্যাস বা তেল স্থলভাগে আনার জন্য প্রয়োজন হবে পাইপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ, যার জন্য অতিরিক্ত অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। ফলে সব প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলেও সমুদ্র থেকে জ্বালানি সম্পদ আহরণ করে দেশের ব্যবহারের উপযোগী করতে প্রায় এক দশক সময় প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরের পরিবেশ সবসময় অনুকূল থাকে না। সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়া, গভীর সমুদ্রের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রয়োজন। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংশোধিত উৎপাদন বণ্টন চুক্তির বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্লকে সফলভাবে গ্যাস আবিষ্কৃত হলে সেখানে ২৫ বছর পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন চালানো যাবে। অন্যদিকে তেলক্ষেত্রের ক্ষেত্রে উৎপাদনের মেয়াদ হবে ২০ বছর। প্রয়োজন ও সম্ভাবনা বিবেচনায় পরবর্তীতে উভয় ক্ষেত্রেই আরও ১০ বছর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ থাকবে। ফলে সফল অনুসন্ধানের মাধ্যমে একটি ব্লক থেকে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান পাওয়া যেতে পারে।

Link copied!