প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ১১:১১ এএম
1692
১৫ জুন ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
“দেশের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর মৌলিক শিক্ষার অধিকার ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক সুযোগ-সুবিধা যদি অনগ্রসর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, তবেই দেশ থেকে সত্যিকারের সুপ্ত প্রতিভা অন্বেষণ সম্ভব। উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ের এই বিপুল মেধা বিকাশের পথ আরও সুগম হবে ইনশাল্লাহ,” বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
গতকাল রোববার (১৪ জুন) বিকেলে রাজধানীর বি এ এফ শাহীন কলেজ মিলনায়তনে ঢাকা জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন শোকেসিং’ (নতুন উদ্যোগ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবন প্রদর্শনী) প্রতিযোগিতার ঢাকা জেলা পর্যায়ের সমাপনী ও বর্ণাঢ্য পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীনে ‘সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ (এসইডিপি)-এর আওতাভুক্ত ‘এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম’-এর উদ্যোগে দেশব্যাপী মেধা অন্বেষণের অংশ হিসেবে এই মেলার আয়োজন করা হয়। এবারের বিজ্ঞান মেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মেধা, বিজ্ঞান, উদ্যোগ ও উদ্ভাবনের দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. জুবাইদা রহমান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবহেলিত ও জরাজীর্ণ স্কুলগুলোর বাস্তব ও দুঃখজনক চিত্র তুলে ধরেন এবং চরম প্রতিকূল পরিবেশেও গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মেধার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অবহেলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, পিরোজপুরের ইন্দুরকানী, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী, ঝালকাঠির রাজাপুর, মুন্সিগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বিভিন্ন স্কুল দীর্ঘদিন ধরে নানা অবকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের এই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো প্রায়ই ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও কাঠামোগত অবহেলার শিকার হয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অনগ্রসর ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য যদি শহরের মতো সঠিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ও ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে তারা দেশের বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী খাতে অভাবনীয় বৈপ্লবিক অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
ডা. জুবাইদা রহমান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “বিগত বছরগুলোতে চরম অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে গ্রামীণ অনেক স্কুলের অবকাঠামো বেহাল হয়ে পড়েছে এবং বহু স্কুল ভবন পুরোপুরি বিধ্বস্ত রূপ নিয়েছে। কিন্তু আমাদের মাটি ও মানুষের মেধাবী শিক্ষার্থীরা কোনো প্রতিকূলতাতেই তাদের পড়াশোনা থামিয়ে রাখেনি। এমনকি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দও নানা অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কষ্টের মাঝেও ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থেকেছেন। এই অবহেলিত জীর্ণ শ্রেণিকক্ষ থেকেই হয়তো একদিন এমন মেধা বেরিয়ে আসবে, যে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে।”
নিজের একটি আবেগঘন স্মৃতির কথা উল্লেখ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, “আমার আজ খুব মনে পড়ছে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার ৫৪ নম্বর সাউথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি জীর্ণ সাদা দেয়ালের কথা। সেই পুরোনো দেয়ালে লাল রঙে লেখা ছিল জীবনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অমোঘ বাণী, যা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। দেয়ালে লেখা ছিল—‘মানুষ কখনো ব্যর্থ হয় না; হয় সে জিতবে, না হলে সে শিখবে’। এই জীর্ণ দেয়ালের লিখনটি কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জীবনমুখী। এই রকম দেশের হাজারো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জরাজীর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়ালে জীবনের অনেক সুন্দর দিকনির্দেশনামূলক বাণী লেখা আছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগায়।”
তিনি চলমান এই বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন প্রতিযোগিতাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী, যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ আখ্যায়িত করে বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে আনন্দময় করে তুলতে হবে। দলগত কাজ, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের বিকাশ এবং পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে তরুণদের একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মানীয় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রধান মুখপাত্র মাহদী আমিন।
অনুষ্ঠানের শেষাংশে প্রধান অতিথি ডা. জুবাইদা রহমান ঢাকা জেলা পর্যায়ের এই বিজ্ঞান ও স্টার্টআপ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মোট ৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী দলের মধ্য থেকে চূড়ান্ত বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও পুরস্কারের অর্থ তুলে দেন।
এবারের প্রতিযোগিতায় নিজেদের অনন্য উদ্ভাবনী মেধার স্বাক্ষর রেখে ঢাকা জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করার গৌরব লাভ করেছে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ। এছাড়া প্রতিযোগিতায় যৌথ মেধার লড়াইয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে যথাক্রমে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ এবং হলি ক্রস কলেজ।